Editorial

বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্ররা কি আদৌ কাল্পনিক?

প্রেমের উপন্যাস কিংবা জীবনী বিষয়ক লেখা ছাড়াও কৈশোর থেকেই আমার একটা আকাশ জুড়ে ছিল শুধুই গোয়েন্দা কাহিনী। বাঙালির গোয়েন্দা গল্পের ভাণ্ডার তো নীহাররঞ্জন গুপ্ত, সত্যজিৎ রায় কিংবা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়দের সৃষ্ট কালজয়ী চরিত্রদের নিয়ে।  বিদেশী গোয়েন্দাদের সঙ্গে পরিচয় ঘটে পরবর্তীকালে। সেখানে অনন্য চরিত্রের সৃষ্টিকর্তারা (স্যার আর্থার কোনান ডয়েল, জি কে চেস্টারটন, অগাথা ক্রিস্টি, ডরোথি লি শেওয়ার্স) অচিরেই মন কাড়লেন। সত্যি বলতে কোনওদিন মনেই হয় নি এইসব চরিত্ররা শুধুমাত্র স্রষ্টার কল্পনা। রহস্যপ্রেমীদের কাছে তাঁরা এক একজন রক্তমাংসের মানুষের মতোই জীবন্ত।

প্রদোষ সি মিটার

ভাইপো তোপসে আর গোয়েন্দা গল্প লেখক লালমোহন গাঙ্গুলিকে নিয়ে ফেলুদার অধিকাংশ অভিযান। বছর তিরিশের ফেলুদার সখ ডাকটিকিট জমানো এবং দুষ্প্রাপ্য বই সংগ্রহ। চারমিনার সিগারেটের ভক্ত ফেলু মিত্তির মগজাস্ত্রের সাহায্যে রহস্য সমাধানের পাশাপাশি হেঁয়ালিও ভালবাসেন। প্রদোষ মিত্র না বলে নিজেকে প্রদোষ মিটার বলতেই বেশি পছন্দ করেন। তিনি ব্যবহার করেন ৩২ ক্যালিবারের কোল্ট রিভলবার। যদিও লেখক ঠিক কার আদলে এই চরিত্রের জন্ম দিয়েছেন তা নিয়ে আলোকপাত করেন নি। ফেলুদার স্রষ্টা সত্যজিৎ রায় তাঁকে নিয়ে ৩৫ টি বই লিখেছেন। এই চরিত্রকেন্দ্রিক চলচ্চিত্রগুলি আজও বাংলা রূপোলী জগতের পরশপাথর।

গোয়েন্দা নন তিনি সত্যান্বেষী

বয়স তিরিশেরও কম, ঠাণ্ডা মাথার লোক ব্যোমকেশ বক্সী। তাঁর সহজাত বুদ্ধিমত্তা উদঘাটন করেছে বহু রহস্যের। ‘পথের কাঁটা’ গল্পে প্রথম আবির্ভাব ব্যোমকেশের। ‘সত্যান্বেষী’ গল্পে ব্যোমকেশের সঙ্গে আলাপ হয় বন্ধু ও সহকারী লেখক অজিতের। ‘অর্থমনর্থম’ গল্পে সত্যবতীর সঙ্গে ব্যোমকেশের প্রেম হয়। স্যার কোনান ডয়েলের অনুকরণে প্রথমে ব্যোমকেশ ও অজিতকে সাজানো হলেও পরবর্তীকালে লেখক চরিত্র দুটিকে করেছেন স্বতন্ত্র ও মৌলিক। গোয়েন্দার বদলে লেখক চরিত্রকে সত্যান্বেষী বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ১৯৬৭ সালে ‘চিড়িয়াখানা’ গল্পটি চলচ্চিত্রের রূপ পায় সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে। ৩৬ টি গল্পে সমৃদ্ধ ব্যোমকেশকে শেষবার আমরা পাই ‘বিশুপাল বধ’ গল্পে। গল্পটি অসম্পূর্ণ রেখেই মারা যান লেখক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়।

নিরীহ পাদ্রি

১৯১১ সালে গিলবার্ট কিথ চেস্টারটন ‘ব্লু ক্রস’ গল্পে ফাদার ব্রাউনের সঙ্গে পরিচয় ঘটান। লেখক চরিত্রটি তৈরি করেছিলেন ব্রাডফোর্ডের সেন্ট ক্যাথবার্টের পাদ্রি ফাদার জন ও’কোনরের আদলে। প্রতিটি গল্পেই খ্রিস্টধর্মের নীতিকথা এবং হিতোপদেশ থাকলেও পাদ্রি অপরাধীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। অপরাধীদের শাস্তি না দিয়ে তাদের সুপথে ফিরিয়ে সমাজের মূলস্রোতে আনাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। তাঁর সূক্ষ্ম বুদ্ধি আর প্রখর পর্যবেক্ষণ শক্তির সাহায্যে অত্যন্ত জটিল সমস্যাগুলির সমাধান সহজেই হয়ে যেত। মাথায় টুপি ও বগলে লম্বা ছাতা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো ছিল তাঁর এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ‘ব্লু ক্রস’ অবলম্বনে ১৯৩৪ সালে ‘ফাদার ব্রাউন, ডিটেকটিভ’ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়।

২২১ বি বেকার স্ট্রিট

স্যার আর্থার কোনান ডয়েল ছিলেন পেশায় চিকিৎসক। রোগী দেখার ফাঁকে ফাঁকেই অন্যান্য গল্পের সঙ্গে তিনি সৃষ্টি করেন শার্লক হোমসকে। চরিত্রটি তিনি সৃষ্টি করেন ‘রয়্যাল ইনফর্মারি অব এডিনবরা’ এর শল্য চিকিৎসক ডাক্তার জোসেফ বেলের আদলে। ১৮৮৭ তে ‘এ স্টাডি ইন স্কারলেট’ গল্পে আত্মপ্রকাশ হয় হোমসের। হোমস তাঁর বন্ধু ও সহকারী ডঃ জন এইচ ওয়াটসন থাকতেন ২২১ বি বেকার স্ট্রিটে। বর্তমানে সেখানে বিরাজ করছে শার্লক হোমস মিউজিয়াম। ‘ফাইনাল প্রবলেম’ গল্পে লেখক হোমসের মৃত্যু ঘটালেও পাঠককূলের অনুরোধে তাঁকে আবার ফিরিয়ে আনা হয় ‘দ্য রিটার্ন অব শার্লক হোমস’ গল্পে। ‘এ স্টাডি ইন স্কারলেট’, ‘দ্য হাউন্ড অব বাস্কারভিলস’, ‘দ্য ভ্যালি অব ফিয়ার’ এই চারটি উপন্যাস ছাড়াও ৫৬ টি ছোটগল্পে বেঁচে রয়েছেন হোমস। এখনও আট থেকে আশির অনেকেই মজে রয়েছেন তাঁর যাদুতে।

দ্য লিটল গ্রে সেল

বেলজিয়ামের নাগরিক হলেও এরকুল পোয়ারো থাকতেন লন্ডনের স্যান্ডহার্স্ট স্কোয়ারের হোয়াইট হেভেন ম্যানসনে। ছোটখাটো চেহারার এই মানুষটি তাঁর মিলিটারি কায়দায় কাঁটা গোঁফে নিয়মিত মোম লাগাতেন। তবে এই গোয়েন্দা অসম্ভব ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন চরিত্র। সিগারেটের টুকরো কিংবা হাত-পায়ের ছাপের ওপর ভরসা না করে তিনি নিজস্ব কায়দায় অনুসন্ধান চালাতেন। তদন্ত চলাকালীন ‘দ্য লিটল গ্রে সেল’ কথাটি তাঁর মুখে শোনা যায়। ১৯৩২ সালে ‘অ্যালিবাই’ চলচ্চিত্রে পোয়ারোর আগমন রূপোলী পর্দায়। এছাড়াও তাঁর চরিত্রকে কেন্দ্র করে তৈরি ‘অ্যালফাবেট মার্ডার’, ‘মার্ডার ইন ওরিয়েন্টাল এক্সপ্রেস’ ইত্যাদিও উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৫ সালে ‘কার্টেনঃ পোয়ারোস লাস্ট কেস’ উপন্যাসে পোয়ারো এবং তাঁর সহকারী হেস্টিংসকে শেষবারের মতো দেখতে পাই আমরা।

 

গল্পের এই গোয়েন্দারা কখন যে গুটি গুটি এসে আমাদের মনের একটা কোণ দখল করেছে বুঝতেই পারিনি। ব্যতিক্রমী চিন্তাধারা কিংবা প্রখর পর্যবেক্ষণ শক্তিও তাদের বইয়ের দুই মলাটে সীমাবদ্ধ রাখতে পারে নি। যেন আমাদের খুব কাছের কোনও মানুষই আসলে হয়ে উঠেছেন অসাধারণ, অনন্য। আর এখানেই গল্প আর বাস্তব মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে নির্দ্বিধায়।

Promotion