EXCLUSIVE NEWS

ধ্রুপদী সঙ্গীতের হাত ধরে ফরাসডাঙ্গার বুকে বর্ষামঙ্গল

 

 

সঙ্গীত নিয়ে এতো মাতামাতি, গ্ল্যামারের হাতছানি, এসবের মাঝে ভারতীয় ধ্রুপদী গান হয়ে যাচ্ছে সঙ্গীত সাম্রাজ্যের দুয়োরাণী। আসলে হয়তো ভাবনা-চিন্তার দিক দিয়ে আমরা ক্রমশঃ পিছিয়ে পড়ছি। আমরা বোধহয় আমেরিকা,ইংরাজী আর সোশ্যাল নেটওয়ার্ক নিয়েই বেশি ব্যাস্ত হয়ে পড়েছি। ভুলে যাচ্ছি নিজেদের শিকড়কে, হ্যাঁ, ভুলে যাচ্ছি ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতকে। তাই নিছক স্বাদবদলের জন্য নয়, বরং নিজের সংস্কৃতির শিকড়ের খোঁজেই গত ২৩ জুন, শনিবার উপস্থিত হয়েছিলাম চন্দননগরে। সেখানকার জ্যোতিরিন্দ্র ভবনে স্বর-সাধনার  সঙ্গীত সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে অন্য কিছু উপলব্ধির আশা নিয়ে বিকেলের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম। বর্ষাকে আবাহন জানিয়েই এই অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। প্রসিদ্ধ মার্গীয় সঙ্গীত সাধক শ্রী প্রশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের ছবিতে মাল্যদান করে শুরু হল এদিনের সঙ্গীত-যাত্রা।

প্রথমেই পারফর্ম করলেন প্রসিদ্ধ ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত-প্রশিক্ষক এবং গায়ক প্রসেনজিৎ চক্রবর্তীর দুই শিষ্য। তাঁরা হলেন যথাক্রমে গৌরব দে এবং আদীপ্ত সেনগুপ্ত। তবলায় তাদের সঙ্গত করলেন জয়তু চক্রবর্তী। এরপর মঞ্চে অবতীর্ণ হলেন প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সুমিত দাস। এবারের নিবেদন ছিল গীতি-আলেখ্য ‘ঝর ঝর বরিষে’। এই সমগ্র উপস্থাপনাটিকে কথার মালা পরিয়ে একটি সুন্দর রূপ দিলেন পাপিয়া হালদার চট্টোপাধ্যায়। সুমিত দাস জানালেন, আষাঢ় ও শ্রাবণ চিরাচরিত ভারতীয় ভাবনায় বর্ষার ঋতু। সেই ভাবনা থেকেই তার এই প্রচেষ্টা। তবলায় সঙ্গত করলেন স্বপন অধিকারী। এসরাজ বাদক হিসেবে ছিলেন অঞ্জন বসু এবং হারমোনিয়ামে ছিলেন কমলাক্ষ মুখার্জী। এভাবেই গানে এবং কথায় নতুন করে রচিত হল এক বর্ষামঙ্গল।

এরপরের নিবেদন ঘিরে সামান্য হলেও অস্বস্তি ছিল। কারণ ছোটবেলা থেকেই শুধু তবলাবাদন শুনতে একঘেয়েই লাগতো। তবে তবলিয়া পলাশ সরকার মঞ্চে এসে মাত্র কয়েক মিনিটেই সেই আশঙ্কার মেঘকে দূরে ছুঁড়ে ফেললেন। প্রায় আধ ঘণ্টা দর্শক মোহিত হয়ে শুনলেন তার ত্রিতাল। উপভোগ করলেন ‘ধা থু না না ঘে থু না’। গোটা অনুষ্ঠানে সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন অজয় কুমার বারিক।

এবার চন্দননগরের বোদ্ধা দর্শকরা অপেক্ষা করছিলেন ক্লাইম্যাক্সের জন্য। মঞ্চে এলেন বহু প্রতীক্ষিত শিল্পী প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী। তার সঙ্গে হারমোনিয়ামে ছিলেন কমলাক্ষ মুখার্জী। তানপুরা এবং কণ্ঠ সহযোগিতায় সঙ্গত করলেন সৈকত মজুমদার। মল্লার গোস্বামী ছিলেন তবলার দায়িত্বে। প্রায় এক ঘণ্টার এই উপস্থাপনা একটুও একঘেয়ে লাগে নি। অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে দর্শকদের করতালিই ছিল এর প্রমাণ। বাদ্যযন্ত্রের ভিতের ওপর প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী গড়ে চললেন একের পর এক বন্দিশের ইমারৎ। স্বরমণ্ডল বাদ্যযন্ত্রের সাহায্য নিয়ে শিল্পী পরিবেশন করলেন মিয়াঁ কি মল্লার। তারপর একে একে তার কণ্ঠ থেকে শুনলাম বিলম্বিত রচনা, একতালে নিবদ্ধ বন্দিশ, আলি বুন্দরিয়া বর্ষা। একটি অত্যন্ত প্রাচীন কম্পোজিশন মধ্যলয় একতাল। দ্রুত তিনতালে নিবদ্ধ এবং তারপর সংক্ষিপ্ত কাজরি যা মিশ্র গারার ওপর আধারিত। এর বোল ছিল ‘ঝমাঝম পানি ভরেলি কৌন’। এভাবেই এদিনের মতো শেষ হল ভারতীয় সংস্কৃতির আকরের সন্ধান।

অনুষ্ঠান শেষে একান্ত আলাপচারিতায় প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী জানালেন, বিভিন্ন ঘরানাকে এক জায়গায় নিয়ে আসা এবং বর্ষাকে আবাহন করার ভাবনা থেকেই তাদের এই ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত সন্ধ্যা।

 

Promotion