Notice: Undefined index: status in /home/dailynew7/public_html/exclusiveadhirath.com/wp-content/plugins/easy-facebook-likebox/easy-facebook-likebox.php on line 69

Warning: Use of undefined constant REQUEST_URI - assumed 'REQUEST_URI' (this will throw an Error in a future version of PHP) in /home/dailynew7/public_html/exclusiveadhirath.com/wp-content/themes/herald/functions.php on line 73
ক্যামেলিয়া - আবৃত্তির সংসারে এক বিরামহীন ডুবোজাহাজ - Exclusive Adhirath
মেঘে ঢাকা তারা

ক্যামেলিয়া – আবৃত্তির সংসারে এক বিরামহীন ডুবোজাহাজ

 

হুগলীর মফঃস্বলেরই এক বাচিক শিল্পী ক্যামেলিয়া বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি তাঁর কণ্ঠ নিয়ে কিন্তু পৌঁছে গেছেন বাংলার বহু গ্রামে ও শহরে। তারই ভাষায় কবিতা তাঁকে অনেক কিছু দিয়েছে। তিনিও সেই প্রাপ্তি উপুড় করে দিতে চান সমাজের কাছে, আমাদের কাছে। অকপট অনেক কথাই তিনি জানালেন ‘এক্সক্লুসিভ অধিরথ’ কে।

প্রশ্নঃ- কী ভাবে আপনি একজন বাচিক শিল্পী হয়ে উঠলেন?

উত্তরঃ- প্রথম থেকেই এমনটা ভাবি নি যে আবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত হবো। নার্সারিতে পড়াকালীন মায়ের কাছে সুকুমার রায়ের কবিতা দিয়ে শুরু হয় আবৃত্তির সঙ্গে সম্পর্ক। স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করে প্রশংসা পাই। প্রতিটা মানুষই তাঁর প্রশংসার জায়গার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সেটিকেই আঁকড়ে ধরেন। তবে তখন আমার ততোটা বোধশক্তি ছিল না। আমার অভিভাবকরা এক্ষেত্রে আমাকে গাইড করেন। আবৃত্তি, গান, আঁকাতেও আমি মুন্সিয়ানার পরিচয় দেই। সেগুলোও সমানতালে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। তবে একটা সময় বুঝতে পারি যে, ক্যামেলিয়ার সঙ্গে অন্য সব কিছু গৌণ। আবৃত্তিটাই একমাত্র যেতে পারে।

প্রশ্নঃ- আপনার কেন মনে হল আবৃত্তি দিয়েই আপনার বার্তা সকলের কাছে পৌঁছে দিতে পারবেন?

উত্তরঃ- আমাদের সমাজে অনেক শিল্প রয়েছে এবং সেগুলো বেশ আকর্ষণীয়। গান, নাচ যে কোনও কিছুর বাহ্যিক সৌন্দর্য্য রয়েছে। তবে বহুবার আমি খেয়াল করেছি, এক ভদ্রলোক রাস্তায় দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোনে কথা বলছেন। হতেই পারে সেটি কোনও রাজনৈতিক বক্তব্য। তাঁর সামনে বেশ কিছু মানুষের ভিড়। আমার মনে হল, মানুষটি আসলে একজন সঙ্গীতশিল্পীর থেকেও ক্ষমতাশালী। সেখানে কোনও সুর, তাল, লয় নেই; শ্রুতিমধুর কিছুও নেই। রাস্তার এতগুলো মানুষকে তিনি স্রেফ কথার জোরেই দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। সেই সময় থেকে আমারও মনে হল, কথার মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়াটা চ্যালেঞ্জ। পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষার হার এতো বেশি নয় যে কবিরা যা লিখছেন খুব সহজেই বইয়ের মাধ্যমে তা সকলের কাছে পৌঁছে যাবে। তাই একজন মানুষ হিসেবে আমার দায়িত্ব, কবিদের অনুভুতিগুলো পৌঁছে দেব আপনাদের কাছে। সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছি।

 

প্রশ্নঃ- আপনি নিজে কবিতা লেখেন? সেই কবিতা কী মঞ্চস্থ করেন?

উত্তরঃ- ছোটবেলা বেলা থেকেই কবিতা লেখার শখ ছিল। এক্ষেত্রে বাবা আমাকে অনুপ্রাণিত করতেন। তিনি বলতেন, “তুই তো আবৃত্তি করিস, এতো কবির কবিতা শুনিস, তাহলে নিজের কথা কবিতার আকারে কেন লিখতে পারিস না?” তখন নিজেকে প্রশ্ন করি, “আমি কি পারি লিখতে?” তারপর চেষ্টা শুরু করি লেখার। এই চেষ্টা করতে করতে কবিতার সংখ্যাটা বাড়তে লাগলো। এরপর একটি সংস্থার মাসিক পত্রিকায় প্রথম ছাপা হয় আমার কবিতা। অনেকগুলি সংখ্যায় আমার কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এই মুহূর্তে সেরকম লেখা হয়ে উঠছে না। তবে আমি মঞ্চে কার্যত অন্য কবিদের কবিতাই পাঠ করি, নিজের নয়। মানুষ ক্যামেলিয়াকে যে কবিতাগুলোর জন্য চেনে, আমার লেখা কবিতা সেই পর্যায়ে এখনও পৌঁছতে পারে নি বলেই আমার মনে হয়।

প্রশ্নঃ- বাচিক শিল্পী হিসেবে কী কী উল্লেখযোগ্য কাজ এখনও করেছন?

উত্তরঃ- ইউটিউবে বেশ কিছু কবিতা মুক্তি পেয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বহু জায়গাতেই আমি পারফর্ম করেছি। বিচারকের আসনে বসারও সৌভাগ্য হয়েছে। তবে নিজেকে প্রকৃত সন্তুষ্ট করতে পারে এরকম কোনও উল্লেখযোগ্য কাজ এখনও করে উঠতে পারি নি।

প্রশ্নঃ- ১৮ বছরের দীর্ঘ পথ চলায় কিছু সুন্দর স্মৃতি শেয়ার করুন।

উত্তরঃ- কলকাতায় একটি ট্যালেন্ট হান্টে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে একটি অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেখানে বিচারকের আসনে ছিলেন রত্না মিত্র এবং কাজল সূর। আমি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বারাঙ্গনা’ কবিতাটি বলি। তারপর বিচারক রত্না মিত্র বললেন, আমার গলায় কাজী নজরুল ইসলাম ভালো মানায়। আমি তখন অন্য একটি কবিতা শোনানোর অনুরোধ করলে তাঁরা সম্মতি দেন। আমি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘যদি নির্বাসন দাও’ কবিতাটি পারফর্ম করি। তখন রত্না মিত্র প্রশংসা করে বলেন, বিভিন্ন কবির বিভিন্ন কবিতা পৃথক ভঙ্গীতে আমি বলতে সক্ষম। আমি সক্ষম তাদের ধারাকে আত্মস্থ করতে। এটি খুবই অনন্য একটি অভিজ্ঞতা আমার কাছে।

প্রশ্নঃ-আপনি গ্রাম এবং শহর দুই জায়গাতেই অনুষ্ঠানে যান। চোখে পড়ার মতো কোনও ফারাক লক্ষ্য করেন?

শহরের ক্ষেত্রে দেখি, আমার কবিতা মানুষ মনোযোগ দিয়েই শুনছেন। কিন্তু কবিতাটি বলার পরেই তাদের থেকে মন্তব্য পাচ্ছি, “এই কবিতাটা কেন নির্বাচন করলে? এটা তো ওমুক পার্টির ধার ঘেঁষে যাচ্ছে, তাঁর মানে কি তুমি সেই পার্টির সমর্থক? সেই কবিতাটি বললে ভালো হত, আমরা যারা কবিতাটা আসলে বেশি বুঝি তাদেরই ভালো লাগতো”। অথচ তারপরেই দেখলাম সেই ব্যাক্তিটিই তাঁর গাড়িতে উঠে একটি চটুল হিন্দি গান চালিয়ে বাড়ি যাচ্ছেন। তাই বলে শহুরে মানুষদের আন্তরিকতা কম সেটা কিন্তু নয়।

ধরা যাক একটি গ্রামে আমি কঠিন ভাষার একটি কবিতা আমি বলছি। গ্রামের মানুষ কিন্তু চুপ হয়ে সেটি শোনে, বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু আমি মঞ্চ থেকে নামার পর আমার কবিতা নিয়ে কাটা-ছেঁড়া করেন না। তাঁরা বরং আমার পারফরমেন্সের সমালোচনা করেন। তাঁরা নিজেদের অনুভূতির কথা আমার সঙ্গে ভাগ করে নেয়। আমি সেখানে একদিন ‘ময়ূরপঙ্খী’ আবৃত্তি করি, তখন এক ভদ্রলোক এগিয়ে এসে আমার সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, একটি সিদ্ধান্ত তিনি নিতে পারছিলেন না। এখন আমার কবিতাটি শুনে তিনি সন্তান দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন। তখন সত্যিই নিজের ওপর গর্ব হয়। মনে হয় আমি কোথাও গিয়ে ছুঁতে পেরেছি মানুষের মন।

প্রশ্নঃ- বাচিক শিল্পী হিসেবে আপনার অনুভূতি কী?

উত্তরঃ- আবৃত্তি কয়েক দশক আগেও ক্লাসের মধ্যে অর্থাৎ শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। একেবারেই সেভাবে জনপ্রিয়তা পায় নি। তখনকার যারা শিল্পী তাঁরা অত্যন্ত শ্রদ্ধেয়। কিন্তু তাঁরা একটা গুরুগম্ভীর ঢংইয়েই কবিতা বলে যেতেন। রবীন্দ্রনাথ বা যে কোনও কবিই তাঁর কবিতাকে নির্দিষ্ট স্বরলিপিতে বেঁধে যান নি। তাই বর্তমানে ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো শিল্পী কবিতা পাঠে নিয়ম ভেঙে যে নতুন ধারার প্রচলন করেছেন তাঁর সঙ্গে আমি অত্যন্ত সহমত। একজন অধ্যাপকের কাছে আমার কবিতা যতোটা গ্রহণযোগ্য হবে, ততোটাই যেন একটি রিকশাওয়ালার কাছেও হয়। সমস্ত দাড়ি, কমা, নিষেধ ভেঙে; নিজের অনুভূতি দিয়ে পরিবেশন করা কবিতা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যাক।

প্রশ্নঃ- আপনার আগামী কোন কোন কাজ মুক্তির অপেক্ষায় দিন গুনছে?

উত্তরঃ- আধুনিক কবিতার ওপর একটি নতুন অ্যালবামের কাজ চলছে। আগামী ২২ শে শ্রাবণও আমার আরেকটি অ্যালবাম মুক্তি পাচ্ছে। রবিঠাকুরের কবিতা এবং রবিঠাকুরকে নিয়ে অন্যান্য কবিদের লেখা কবিতার মিশ্রণ এটি। ‘শেষের কবিতা’ নিয়েও আরেকটি কাজ মুক্তি পাচ্ছে যেখানে আমি কেতকীর চরিত্রে কণ্ঠ দিয়েছি।

প্রশ্নঃ- কোন কোন শিল্পীর কাজ আপনার ভালো লাগে?

উত্তরঃ- ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রায় সব কবিতাই ভালো লাগে। মেধা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আঞ্চলিক কবিতা ভীষণই ভালো লাগে। মুনমুন ব্যানার্জীর প্রেমের কবিতা বেশি শুনি।

বাচিক শিল্পী হিসেবে আপনি কী কী কৌশল অবলম্বন করেন? আপনি অনুশীলনই বা কী করে করেন?

আমি আত্মিক ভাবে কবিতা বলি, নিজের অনুভূতি থেকে বলার চেষ্টা করি। আলাদা করে কোনও কৌশল অবলম্বন করি বলে আমার মনে হয় না।  গানের সরগম অনুশীলন করতে হয়। সেই সঙ্গে গলার যত্ন নিতে হয়। কিছু নিয়ম মানতে হয়, যেরকম বেশি জোরে কথা বলি না। তাছাড়া আমার মনে হয়, যে কোনও বাচিক শিল্পী নিয়মিত নজরুল এবং রবি ঠাকুরের কবিতা নিয়মিত রেওয়াজ করলে সুফল পাবেন। কারণ এই কবিতাগুলিতে যথেষ্টই চড়াই-উতরাই থাকে। যা আদতে আবৃত্তিতে সহায়ক হিসেবেই কাজ করে।

প্রশ্নঃ- আবৃত্তির জন্য নিশ্চয়ই আপনাকে আইসক্রিমের মতো লোভনীয় খাবার খাওয়া ছাড়তে হয়েছে। এটা কী খারাপ অনুভূতি?

উত্তরঃ- (মৃদু হেসে)হ্যাঁ, আইসক্রিম আর পান দুটোই ত্যাগ করতে হয়েছে। তবে এটা কষ্ট করে ত্যাগ করি নি। নির্লজ্জভাবেই বলছি, আমি প্রশংসা পেতে খুব ভালবাসি। সেই জায়গা থেকে একশোটা লোকের প্রশংসা আমার কাছে আইসক্রিম বা পানের থেকে অনেক বেশি লোভনীয়।

প্রশ্নঃ- বর্তমানে বেশিরভাগ অনুষ্ঠানেই আবৃত্তিকে খুব গুরুত্ব সহকারে দেখা হয় না, এটা কেন? এ ব্যাপারে আপনার অভিমতই বা কী?

উত্তরঃ- হ্যাঁ, আপনি যেটি বললেন সে ব্যাপারে আমি পুরোটাই সহমত পোষণ করছি। বেশ কিছু অনুষ্ঠান করতে গিয়ে এরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে যা নেতিবাচক। গানের অনুষ্ঠানে বাদ্যযন্ত্র রেডি করার আগে একটি আবৃত্তি ঢুকিয়ে দেওয়ার মানসিকতা আছে। তবে এই পরিস্থিতির জন্য মানুষকে পুরোটা দোষ দিয়েও লাভ নেই। এটি বাচিক শিল্পীদের পরিবেশনার ওপরেও নির্ভরশীল। একই ছন্দে যদি আমি বলে যাই কবিতা, যাতে কোনও মডিউলেশন নেই তাহলে মানুষ শুনবে না। একটি প্রতিবাদী কবিতায় নেই কোনও প্রতিবাদ। একটি বৃদ্ধাশ্রমে মায়ের জবানবন্দী বলছি সেখানে নেই ছেলে হারানোর শোক। তাহলে কেন মানুষ তাঁর ব্যস্ততা থেকে সময় চুরি করে আমার কবিতা শুনবে? তাই আমি বলতে চাই না মানুষ আবৃত্তিকে অবহেলিত করছে। যারা আবৃত্তিকার তারাই এর জন্য অনেকাংশে দায়ী।

 

প্রশ্নঃ- আবৃত্তি ছাড়া আপনি আর কী কী করেন?

উত্তরঃ- আমি চিত্রনাট্য লিখি। সঞ্চালিকা হিসেবে কাজ করা আমার অন্যতম একটি পেশা। তাছাড়া বেশ কিছু নাট্যদলের সঙ্গে শ্রুতিনাটকেও কাজ করেছি।

প্রশ্নঃ- বাচিক শিল্পী হিসেবে আপনার স্বপ্ন কী? কোন লক্ষ্যে পৌঁছতে চান?

উত্তরঃ- আমি অবশ্যই সফল একজন বাচিকশিল্পী হতে চাই। নিজের পরিচিত গণ্ডি আরও ছাড়িয়ে বহুদুর যেতে চাই। তবে আমার লক্ষ্যটা একটু অন্যরকম।

আমি আবৃত্তি করবো শ্রেণীর জন্য নয়, সাধারণের জন্য। সাধারণ মানুষের কাছে এটিকে একটি সহজ মাধ্যম হিসেবে নিয়ে যেতে চাই। আবৃত্তি কিন্তু এখনও অনেকের কাছে গান, নাচ বা নাটকের মতো সহজ নয়। তো আমি সেই জায়গায় আবৃত্তিকে তুলে ধরতে চাই যাতে সবাই এটিকে আত্মিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেন।

 

 

 

 

 

 

 

Promotion