বিশেষ অবশেষ

“কান পেতে শোনো হাতুড়ি এখনও শ্রমিকের গান গায়”

শুরুর সেদিন থেকে আজও নিরলসভাবে গড়িয়ে চলেছে সভ্যতার চাকা। আর এটা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না, শ্রমিকের হাতুড়ির জোরই সেই চাকার অন্যতম চালিকাশক্তি। খেটে খাওয়া মেহনতী শ্রমিকরা আসলে টানে পুঁজিপতিদের বোঝা। কিন্তু সভ্যতার এই পিলসুজরা কখনই সেভাবে পায়না যোগ্য মর্যাদা। বর্তমান ভোগবাদী সমাজে তাদের ধর্তব্যের মধ্যে না আনাটাই রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৮৮৬-এর ১ লা মে আমেরিকার শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে প্রথম রাস্তায় নামেন। সেই থেকেই এই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে তাই এক সাধারণ শ্রমিকের বক্তব্য শোনার তাগিদে আমরা হাজির হলাম প্রবীর ব্যানার্জীর বাড়িতে। মানকুণ্ডুর বাসিন্দা প্রবীরবাবু ভদ্রেশ্বরের ভিক্টোরিয়া জুটমিলের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক। কী বললেন তিনি? আসুন শোনা যাক,

‘মে দিবস’ কি আজ শুধুমাত্র একটি ছুটির দিন, নাকি এর তাৎপর্য আজও বেঁচে রয়েছে?

উত্তরঃ- সাতের দশকের শেষের দিকে আমরা যখন চাকরিতে ঢুকেছিলাম, তখন মে দিবসের অন্য তাৎপর্য ছিল। ওই দিনটি আসলেই এক আলাদা উত্তেজনা হত। আমরা পালন করতাম। মনে একটা জোর ছিল। কিন্তু এখন দিনটি একটি ছুটির উৎসবে পরিণত হয়েছে।

একজন শ্রমিকের ধর্ম কী? তাঁর কাছে সব থেকে বড় মন্দির, মসজিদ বা গির্জা কোনটি?

উত্তরঃ- উৎপাদন করাটাই হল শ্রমিকদের কাছে সব থেকে বড় ধর্ম। কারখানাটাই আমার কাছে সবথেকে বড় ধর্মস্থান। মন্দির, মসজিদ বা গির্জা যাই বলুন, ওই কারখানাই আমার কাছে সব।

শ্রমিকরা কি তাদের ন্যায্য অধিকার পাচ্ছেন?

আমরা যে কাজটা করতাম তার টাকা হাতে দিত ১৫ দিন অন্তর। এখন সেটা বন্ধ করে ব্যাঙ্কে টাকাটা দিয়ে দিচ্ছে। ফলে একদিন ছুটি নষ্ট করে ব্যাঙ্কে সেটা তুলতে যেতে হচ্ছে। তার ওপর উৎপাদনের পরিমাণ নিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ ঠকাচ্ছে। ধরা যাক, একজন শ্রমিক যদি ১০০% উৎপাদন দেয়, কারখানা কর্তৃপক্ষ সেটি ৫০% এরও কম করে দেখায়। কোনও প্রমাণের ব্যাবস্থা না থাকায় আমরাও কিছু বলতে পারি না।

এক সদ্য অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক হিসেবে আপনাকে কী কী সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে?

যখন আমরা অবসর নেই, তখন আমাদের হাতের সম্বল বলতে পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং গ্র্যাচুইটি। কাজ ছাড়ার ৪৫ দিনের মাথায় প্রভিডেন্ট ফান্ড দেওয়ার কথা, যা পাচ্ছি ৯০ দিন পর। পেনশনের টাকাও পাওয়ার কথা অবসর গ্রহণের পরের মাস থেকেই। কিন্তু সেটা অপেক্ষা করাচ্ছে ১ বছর। আর গ্র্যাচুইটির কোনও প্রশ্নই নেই। অনেক টালবাহানার পরে হয়তো দশ হাজার টাকা ধরিয়ে দেবে। বাকি টাকার থেকে বঞ্চিত হতে হবে। আদালতের শরণাপন্ন হতে হলেও কতদিনে সুবিচার পাবো জানা নেই।

কান পাতলে প্রায়ই শোনা যায়, ‘প্রতিষ্ঠিত ট্রেড ইউনিয়নগুলোই শ্রমিক আন্দোলনকে শেষ করে দিল’, এটা কতোটা সত্যি?

ট্রেড ইউনিয়নগুলোই এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে তাদের ছাড়া কোনও কাজ হবে না। কিন্তু তাঁরা আসলে শ্রমিকদের প্রকৃত স্বার্থে কোনও কাজ করছেন না। কোনও সমস্যা নিয়ে তাদের কাছে গেলেই তাঁরা খালি আশ্বাস দেন। এমনকি তাদের মেকি আন্দোলন-বিক্ষোভে সামিল হতে বলেন। তারপর তাঁরা নিজেরাই পুলিশ ডেকে গ্রেফতার করিয়ে দেন সাধারণ শ্রমিকদের। কাজেই তাদের বিশ্বাস করার প্রশ্নই ওঠে না।

বর্তমান পরিস্থিতিতে শ্রমিকরা কি আদৌ দিনবদলের স্বপ্ন দেখতে এবং দেখাতে পারবেন?

শ্রমিকদের যা অবস্থা তাতে দিনবদল তো দূরের কথা, সে স্বপ্নই দেখতে পারছে না। কোনও শ্রমিক যদি সমস্যা নিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলতে যায়, সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানি তাঁকে দালাল হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলে। যদিও এতো কিছু করেও দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না শ্রমিকদের। ডালহৌসি, হুকুমচাঁদ, কানেরিয়া, ভিক্টোরিয়ার মতো কারখানায় কিছু কিছু ফুলকি জন্ম নিচ্ছে। সেগুলো যদি আগামী দিনে বড় সংগ্রামে পরিণত হয় তাহলে শ্রমিকদের হাত ধরে দিনবদল হলেও হতে পারে।

About the author

ADHIRATH

9 Comments

Click here to post a comment

Promotion