কাটাকুটি

এ কলকাতার মধ্যে আছে আরেকটা কলকাতা

চেতনার চির অগ্রদূত কলকাতা, আমাদের তিলোত্তমা। প্রিয় শহরের মেট্রোতে সম্প্রতি ঘটে চলা এক ঘটনা হঠাৎ যেন পাল্টে দিয়েছিল যৌবনে বসন্ত মেখে থাকা মহানগরীকে। বড্ড অচেনা, বড্ড বেমানান লাগছিল চেনা কলকাতাকে। এ শহরের নিজস্ব এক রঙ ছিলো। কিন্তু আলিঙ্গনরত দুই যুবক-যুবতী নীতি পুলিশির বলি হয়ে বেধড়ক মার খান। এই প্রবণতা এক রঙহীন সত্ত্বার দিকে নিয়ে যাচ্ছে কলকাতাকে। এই পরিবর্তনের মুখে দাঁড়িয়ে কয়েকজন মানুষ হাঁটা শুরু করে এক অন্য কলকাতার খোঁজে।এটাই গল্প যা এক নতুন রঙের চিরন্তন প্রকাশ।  স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবি ‘আর একটা কলকাতায়’ এর প্রেক্ষাপট রচনা করেছে।পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন বোধিসত্ত্ব মজুমদার। মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন অন্বয় এবং শ্রমণা।

কবীর সুমনের একটি গান ব্যবহার করা হয়েছে ছবিটিতে। সেই প্রসঙ্গে সুমন জানান, এটি খুবই জরুরী বিষয়। সমাজ কোন স্তরে চলে গেলে এরকম ঘটনা ঘটে? আলিঙ্গন কারুর আপত্তিকর মনে হতেই পারে। কিন্তু দুই নবীন-নবীনার গায়ে হাত তোলাটা সমর্থন যোগ্য নয়। দমদম স্টেশনে নামানোর পর মেয়েটি মারের হাত থেকে রক্ষা করছিলেন ছেলেটিকে। তখনও কারুর মনে হল না থেমে যাই। একটি রাজনৈতিক দল দেশে ক্ষমতার অলিন্দে বসে। তাঁরা নিদান দিচ্ছে একটি ধর্মের কবরস্থ মহিলাদের কবর থেকে তুলে এনে ধর্ষণ করো। এই পরিস্থিতিতে এই ধরণের প্রতিবাদী বিষয় নিয়ে ছবি যত বেশি হয় ততই মঙ্গল। স্লোগান দেওয়া, বিতর্কসভা আয়োজন করার চেয়ে একটা শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদটা অনেক বেশি জরুরী। যারা ছবিটি তৈরি করেছেন তাদের অনেক ভালোবাসা, আদর ও চুম্বন।

ছবিটির চিত্রনাট্য এবং মূল ভাবনার কারিগর অন্বয় জানালেন, গত ১ লা মে মেট্রোয় ঘটা এই নীতিপুলিশির ঘটনাটির সময় এটির বিরুদ্ধে কেউ সেভাবে এগিয়ে আসেন নি। নিজের শহরে এরূপ ঘটনার কথা কানে আসার পর রীতিমত আতঙ্কিত ও ক্রুদ্ধ হয়ে পড়েন তিনি। তখনই মনে হয়েছিল ভালোবাসা, আদর দিয়েই এর একমাত্র প্রতিবাদ হতে পারে। তখনই তিনি এই চিত্রনাট্যটি লিখে ফেলেন। অতি সম্প্রতি দেশে কাঠুয়া, উন্নাওয়ে ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটে গেছে। আরও আশ্চর্যের বিষয়, ধর্ষকের সমর্থনে জাতীয় পতাকা নিয়ে মিছিলও হয়েছে। কিন্তু মেট্রোয় দু’জন মানুষ পরস্পরকে আলিঙ্গন করলে আমাদের প্রতিবাদী সত্ত্বা জেগে উঠছে। সেই জায়গা থেকেই একটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে কাজটি ভাবা। তাঁর মতে, এই ছবি আসলে একটি সময়ের, একটি ঘটনার দলিল হয়ে থাকুক। অন্বয়ের স্থির বিশ্বাস, প্রেম দিয়েই এই নোংরামিগুলো আটকানো সম্ভব।  ছবির অন্য মূল চরিত্রে অভিনয় করা শ্রমণাও জানালেন তাঁর প্রতিক্রিয়া। তাঁর ভাষায়, এটি তাঁর কাছে কোনও সিনেমা বা প্রোজেক্ট নয়, একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদের মাধ্যম। শিল্পের মাধ্যমে বিষয়টি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা। ‘আর একটা কোলকাতায়’ ছবির পরিচালক বোধিসত্ব মজুমদার জানালেন, ইউটিউবে মুক্তি পাওয়ার পর পজিটিভ এবং নেগেটিভ দুই ধরণের প্রতিক্রিয়াই পাওয়া গিয়েছে। যদিও সদর্থক প্রতিক্রিয়াই বেশি পরিমাণে মিলেছে।

ছবিটির ভালো-মন্দ বিচারের দায়িত্ব দর্শকের হাতে। তবে তিলোত্তমার একসাথে বেঁচে থাকার, পাশে দাঁড়ানোর ঐতিহ্যকে রক্ষা করার দায়িত্ব সকলেরই। তাই তো কবির লেখনী জাগ্রত হয়ে বলে উঠছে, ‘”হেঁটে দেখতে শিখুন, ঝরছে কী খুন, দিনে রাতের মাথায়। আর একটা কোলকাতায় সাহেব, আরেকটা কোলকাতায়”।

 

 

Promotion