Notice: Undefined index: status in /home/dailynew7/public_html/exclusiveadhirath.com/wp-content/plugins/easy-facebook-likebox/easy-facebook-likebox.php on line 69

Warning: Use of undefined constant REQUEST_URI - assumed 'REQUEST_URI' (this will throw an Error in a future version of PHP) in /home/dailynew7/public_html/exclusiveadhirath.com/wp-content/themes/herald/functions.php on line 73
আকাশ ধরি চল - Exclusive Adhirath
Editorial

আকাশ ধরি চল

 

একটা আবছা হয়ে যাওয়া স্বপ্ন মাঝে মধ্যেই ঘিরে ধরে। আমার, আমাদের একটা ফেলে আসা জীবন, যেটা আসলে মরে গেছে। আর কোনদিনও ফিরবে না। সেই হারানো শৈশব, যার অনেকটাই জুড়ে রয়েছে গ্রাম্য জীবন।

নদিয়ার গাংনাপুরে অবস্থিত আমার মামাবাড়ি। একেবারেই অজ পাড়া গাঁ। সন্ধ্যে সাতটার পড়ে আমরা আর বাড়ির বাইরে যেতাম না। বিকেল থেকেই চলতো হ্যারিকেনের কাঁচ মোছার পালা। তুলসীতলায় প্রদীপ দিয়ে দিদা জ্বেলে দিতেন হ্যারিকেন। তারপর রান্নাঘরে দিদার কোল ঘেঁষে বসে শুনতাম কোনও গা ছমছমে ভূতের গল্প। বাড়ির সামনেই ছিল পুকুর। অন্ধকারে মনে হত, এক বিশাল রাক্ষসী এলো চুলে দাঁড়িয়ে। মাকে জড়িয়ে ধরে রাতে ঘুমোতাম। জানলা দিয়ে জোনাকি গুনতে গুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়তাম তা টেরই পেতাম না। সকালে হাল্কা শিশিরে সাজি হাতে ছুটতাম সজনে ফুল কুড়োতে। একটু বেলা গড়ালেই ছুটতাম খেলতে। খেলা বলতে সুপারি বাগলোতে বসিয়ে মেঠো রাস্তায় রথ টানা। তালিকায় আরও কিছু খেলাও ছিল। যেমন পিট্টু, ইচিং বিচিং প্রভৃতি।

দুপুরে স্নান করতে যেতাম পুকুরে। প্রায় সব বাড়িতেই ছিল নলকূপ। তবুও পুকুরে একসঙ্গে দস্যিপনা করার মজাই আলাদা ছিল। বাড়ি ফিরে খেয়েদেয়ে চলে যেতাম আমবাগানে। সেখানে শীতলপাটি পেতে গাছের ছায়ায় দিতাম ভাতঘুম।

বিকেলে যখন ঘুম ভাঙতো, দেখতাম সূয্যিমামা বাড়ি ফেরার পথ ধরেছেন। সেই সব ফেলে আসা বিকেলে আমাদের খুব প্রিয় একটি খেলা ছিল। অদ্ভুত সেই খেলার কথা এখন ভাবলে হাসি পায়। খেলাটির নাম ছিল ‘আকাশ ধরি চল’। বহুদূর বিস্তৃত ধানক্ষেতের একপাড় থেকে দেখলে মনে হয় আকাশটা ধানক্ষেতের ওপরেই শেষ। আমরাও সেই আকাশের খোঁজেই ছুটটাম দল বেঁধে। এইভাবে মাইলখানেক যাওয়ার পর গায়ের জোর থাকতো না বিশেষ। তবুও প্রতিবার ক্লান্তিহীনভাবেই খেলতাম এই এক খেলা। ঘরে ফেরার পথে পুকুরের ধারে দাঁড়ালে মনে হতো সূর্য যেন তার সব রং ছড়িয়ে দিয়েছে জলে ফুটে থাকা শালুক ফুলের ওপর।

সেদিন রাতের উপলব্ধি ছিল ‘অদ্য শেষ রজনী’। কারণ পরদিন সকালেই ফিরতে হবে বাড়ি। ফিরে যেতে হবে গতানুগতিক কর্মব্যাস্ততায়। সেই স্কুল, সেই টিউশনের গতে বাঁধা জীবনে। আমার মতো অনেকেরই শৈশবের সাক্ষী এই গাছ, পুকুর, ঘাস, নদী আর শালুক ফুলেদের দল। বিপন্ন পরিবেশের অবিচ্ছেদ্দ্য অঙ্গ হিসেবেই তারাও আমাদের মতোই আজ লড়ছে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। আজকের শৈশবের অধিকাংশ পিঠ বন্দী কেরিয়ারের চাপে। সবাই প্রথম হতে চায়। কেউ দ্বিতীয় হতে রাজি নয়। অনুভূতি, শৈশব এই কথাগুলো আজ নাকি অর্থহীন।

তবুও আজও যখন লোডশেডিং হয় তখন মনে পড়ে অন্ধকারের সেই গা ছমছমে অভিজ্ঞতা। আজও যখন কোনও পুকুরে শালুক ফুলের দেখা পাই, মনে হয় বেঁচে আছি। আমরা এখন সত্যিই খেলি ‘আকাশ ধরি চল’। ইটের ওপর ইট, আর মনটা হয়ে গিয়েছে কংক্রিট। খেলা এখন বন্দী দু’হাতের তালুতে মুঠোফোনে। শৈশবের সীমানা হয়তো সপ্তাহে একদিন ঘড়ি ধরে মাঠে যাওয়া।

নাহ, কাউকে দোষারোপ নয়। কেন হল, কে দায়ী এসব বলতেও চাই না। মাটি ছেড়ে আকাশ ধরার এই লড়াইয়ে কে জিতবে তা জানি না। কিন্তু একটা কথা নিশ্চিত, হয়তো আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে বলতে পারবো না,  ‘খেলবি? আয়, আকাশ ধরি চল’।